রুবিনা আক্তারের মৃত্যু, আমাদের বিবেক ও শিক্ষা

দেশের অন্যতম বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক শিক্ষকের গাড়িচাপায় নিহত হয়েছেন রুবিনা আক্তার নামের একজন নারী। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টিকে হত্যাকাণ্ডই বলছেন, কারণ চালক ইচ্ছা করে পালানোর জন্য হোক বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে হোক গাড়ি না থামিয়ে চাপা পড়া নারীকে টেনে নিয়ে গেছেন যার ফলশ্রুতিতে রুবিনার মৃত্যু হয়।

রুবিনা আক্তারের মৃত্যু, আমাদের বিবেক ও শিক্ষা

দেশে তো প্রতিদিন কতো ভাবেই মানুষ মারা যায়। সড়ক দুর্ঘটনায় জীবন চলে যাওয়া নতুন কিছু নয়। কিন্তু এই যে জেনে-বুঝে একজন মানুষের জীবন নিয়ে নেয়া এটাকে কি নেহায়েত একটি দুর্ঘটনা বলা যায়? গাড়িচালক একজন উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেছেন। যদিও পরবর্তীতে বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে তিনি চাকরিচ্যুত হয়েছেন বলে জানা গেছে। কিন্তু একজন মানুষ তো। তিনি যেহেতু গাড়ি  চালানোর মতো শক্তি রাখেন, ধরে নিচ্ছি একজন সুস্থ মস্তিষ্কের লোক। তাহলে একজন বিবেকবান মানুষের পক্ষে কি সম্ভব একজন মানুষ গাড়িচাপা পড়েছে জানার পরেও গাড়ি না থামিয়ে নিজের জীবন বাঁচানোর (ধরে নিচ্ছি) জন্য চলমান রাখা? আসলে কী তিনি এতে করে নিজের জীবন রক্ষা করতে পেরেছেন নাকি আরও পোক্তভাবে নিজেকে অপরাধীর কাঠগড়ায় হাজির করেছেন? একবারও কি তার মনে হয়নি যে একজন মানুষকে তিনি হত্যা করছেন? সেই নারীর আর্ত চিৎকার কি তার কানে পৌঁছায়নি? আমি নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি যে, আহত রুবিনা তখন গগণবিদারি চিৎকার করছিলেন। আহ!! ভাবতে গেলেও যেন আত্মা কেঁপে উঠছে। আহারে, রুবিনার চোখে নিশ্চয়ই তখন তার সন্তানের চেহারাটা ভাসছিল। জীবনপ্রদীপ নিভে যাচ্ছে বুঝতে পারছিল কিন্তু নিজেকে বাঁচানোর রাস্তা পাচ্ছিল না।

জীবনসঙ্গীহারা রুবিনা একাই বড় করছিলেন একমাত্র সন্তানকে। অষ্টম শ্রেণিতে পড়া বাচ্চাটা আজ বাবা-মা দুজনকেই হারালো। মায়ের এমন মৃত্যুর সংবাদ কেমন করে সইবে বাচ্চাটা? নিজেকে রুবিনার জায়গায় বসিয়ে যখন ভাবছিলাম তখন কেবলি মনে হচ্ছিলো এ কেমন পাষণ্ড দুনিয়া? কেন মানুষ এমন নিষ্ঠুর হয়ে পড়ছে?

আমি জানি না পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়ায় তার কী শাস্তি হবে বা আদৌ হবে কিনা, কিন্তু বেঁচে থাকতে কি তিনি নিজের বিবেকের কাছে জীবিত থাকবেন? হয়তো শারীরিকভাবে বেঁচে থাকলেও মনোজগতে কি পারবেন বাঁচতে?

দিনে দিনে আমরা কেমন যেন অবিবেচক হয়ে পড়ছি। খুব নির্লজ্জভাবেই আমরা স্বার্থপর আর বিবেকহীনতাকে প্রশ্রয় ও প্রমাণিত করছি।

ফেসবুকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মীর সাফায়েত হাসানের একটি স্ট্যাটাস ভাইরাল হয়েছে। তার লেখাটি পড়ে বুঝলাম তিনি ঘটনার একজন প্রত্যক্ষদর্শী এবং রুবিনা আক্তারকে হাসপাতালে নেয়া থেকে মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া পর্যন্ত তিনি সেখানে ছিলেন। তিনি ঘটনার যে বিবরণ দিয়েছেন, সেটি পড়ে শিহরে উঠতে হয়। সাধারণ মানুষ যখন দৌড়ে গাড়িটিকে আটক করে, নীলক্ষেতের মোড়ে তখনও রুবিনা আক্তার বেঁচে ছিলেন। নিথর দেহটি রাস্তার উপরে পড়েছিল।

শাফায়েতের বর্ণনা বলছে, চারপাশের মানুষ ছিল কিন্তু ছিল না একজন উদ্ধারকর্তাও। সবাই গঠনে মানুষ হলেও বিবেকসম্পন্ন কাউকে পাওয়া যায়নি একটি রিক্সা বা গাড়ি ডাকার। রুবিনাকে ঠিক সময়ে হাসপাতালে পৌঁছাতে পারলে হয়তো বাঁচানো যেত। ভিড়ের মধ্যে কেউ ঘটনার ভিডিও করছিল। কেউ গাড়িচালক শিক্ষককে মারধর করছিল, কেউ বা দাঁড়িয়ে আফসোস করছিল, বিশ্লেষণ করছিল। রিক্সাওয়ালারাও দাঁড়িয়ে দর্শকের ভিড় বাড়াচ্ছিল কিন্তু কেউ এগিয়ে এসে অসহায় নারীটিকে বাঁচায়নি।

অনেক চিৎকারের পর একটি ভ্যান নিয়ে আসে শাফায়াতের মতই আরেকজন মানুষ। সেই ভ্যানেই হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল। নীলক্ষেত থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কিন্তু বেশি দূরে নয়। তারপরেও সেখানে উপস্থিত জনতা কোনো ভূমিকা রাখেনি। তাদের কাছে হাসপাতালে নেয়ার চেয়ে ভিডিও করে ফেসবুকে পোস্ট করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে।

এমন উদাহরণ আজকাল প্রায়ই ঘটছে। ভাইরাল হওয়ার লোভ অনেক সময়েই জঙ্গি রূপ নেয়। মনুষত্ব বিবেক এগুলো যেন দিনে দিনে বইয়ের নীতিবাক্য হয়ে পড়ছে। সাফায়েত তার স্ট্যাটাসে প্রশ্ন করেছে “রুবিনা আক্তারকে এক কিলোমিটরের বেশি রাস্তা টেনে নিয়ে গাড়িটা যখন নীলক্ষেত মোড়ে থামল, সাধারণ একজন মানুষ হিসাবে আপনার তখন কি আশা করা উচিত? উত্তরটাও তিনি নিজেই দিয়েছেন “তাকে তৎক্ষণিক হাসপাতালে পাঠানো এবং গাড়িসহ ড্রাইভারকে আটক করে উত্তম-মধ্যম দিয়ে পুলিশে দেওয়া। আমি এটা চাইতাম এবং আমি নিশ্চিত আপনারাও এটা চাইতেন। কিন্তু আমাদের চাওয়া এবং কাজের মধ্যে বিস্তর ফারাক।“ বাস্তব হচ্ছে এই ফারাক দিনে দিনে যেন আরও বেড়েই যাচ্ছে।


লেখাটা শেষ করতে চাই সাফায়েতের কিছু প্রশ্ন আর উত্তর দিয়ে-
“আগে অনেক শুনেছি অসহায় মানুষকে ফেলে রেখে মানুষ ফটোগ্রাফি-ভিডিওগ্রাফি-লাইভ স্ট্রিমিং এ ব্যস্ত হয়ে যায়। আজ নিজে প্রত্যক্ষ করলাম। পথচারী লোকগুলো কি পারত না রুবিনা আক্তারকে ভিডিও না করে সাথে সাথেই মেডিকেলে নিয়ে যেতে বা ঐ রিক্সাওয়ালা মামা কি পারত না এগিয়ে আসতে? কিংবা ওই সাংবাদিক ভাইটির দায়িত্ব কি শুধুই তথ্য কালেক্ট করা? দায়িত্বের ঊর্ধ্বে মানবিকতা বলে কি কিছু নেই? তিনি কি পারতেন না রোগীর স্বজন কেউ আসা অব্দি আমাদের সাথে অপেক্ষা করতে? মানবিক দিক বিবেচনা করার মত মানবিকতাও আমাদের মধ্যে আর নেই। প্রযুক্তির বিকাশের সাথে সাথে মানবিকতা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে!”

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*